মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

জেলার ঐতিহ্য

               নৃ-বৈচিত্র্যে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পার্বত্যাঞ্চলে। এখানে দীর্ঘদিন ধরে এগার ভাষাভষীর 12টি জাতিসত্ত্বা সহাবস্থান করছে। এমন বৈচিত্র্যে ঐক্যতান বিশ্বের কোন দেশে চোখে পড়ে না। এ পাহাড়ি ভূ-ভাগে এতগুলো জাতিসত্ত্বা কখন ,কিভাবে অভিবাসন করেছে তা বলা মুশকিল। কোন জাতিসত্তার কোন লিখিত দলিল দস্তাবেজ না থাকায় এতদঞ্চলের সঠিক ইতিহাস জানার কোন সুযোগ নেই। তবে এসব জনজাতিগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। তারা সেগুলোকে যুগ যুগ ধরে সযতনে লালন করে আসছে। নিম্নে ক‘টি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, নৃত্য ও পূজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো মাত্র।

 

বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুকঃ

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব হচ্ছে বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক। এ লোকজ উৎসব চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি নিয়ে তিনদিনব্যাপী পালিত হয়। চাকমা সমাজে এ তিন দিনকে যথাক্রমে ফুলবিজু, মূল বিজু এবং গজ্জ্যেপজ্জ্যে বলা হয়। মারমা সমাজে দিনগুলোকে যথাক্রমে পাইং ছোয়াই, সাংগ্রাই আফ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং এবং ত্রিপুরা সমাজে হারিবৈসুক, বৈসুকমা ও বিসিকাতাল বলা হয়। উৎসবের প্রথম দিন ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, ছেলে-মেয়েরা ভোরে ফুল তোলে এবং ঘর সাজায় আর কিশোর-কিশোরীরা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের স্নান করায়। উৎসবের দ্বিতীয় প্রত্যেক ঘরে রুচিসম্মত ও সুস্বাদু খাবাবের আয়োজন করা হয়। ঘরের দরোজা থাকে সকলের জন্য উম্মুক্ত। খাবারের মধ্যে বিভিন্ন সবজি মিশিয়ে রান্না করা পাজনহচ্ছে অন্যতম। এ দিনেই মদের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়ে থাকে। উৎসবের শেষ দিনে চাকমারা বাড়িতে ভাল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ দিনে বিহারে বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। অনেকেই আত্মীয় স্বজনের খোঁজ খবরও নিয়ে থাকেন। মারমারা এ দিনে রিলং পোয়েহ্বা Water Festival-এর আয়োজন করে। ত্রিপুরারাদের বিশেষ আয়োজন হচ্ছে গড়াইয়া নৃত্য

 

বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক

 

রাজ পুন্যাহ্

রাজ পুন্যাহ্ ঃ

উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে রাজপ্রথাবিলুপ্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী রাজাগণএখনো সামাজিক প্রধান হিসেবে শাসন কাজ পরিচালনা করছেন। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ১৭৭টি মৌজা নিয়ে চাকমা সার্কেলগঠিত। রাজ পুন্যাহ্হলো এমন একটি অনুষ্ঠান যেখানে চাকমা রাজারাজ দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে বসেন এবং হেডম্যানদের নিকট হতে খাজনা আদায় করেন। পূর্বে এ অনুষ্ঠান প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হত। এ অনুষ্ঠানে রাজার অধীনস্থ হেডম্যান ও কার্বারীগণ খাজনা পরিশোধের পাশাপাশি রাজাকে বিভিন্ন উপটোকন অর্পন করেন।

রিলং পোয়েহ্ বা Water Festival

 

রিলং পোয়েহ্ মূলত সাংগ্রাই আফ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং অর্থাৎ সাংগ্রাই-এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয়। মারমারা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায এ খেলাটি মৈত্রী পানি উৎসবনামে দীর্ঘদিন ধরে পালন করছে। এ উৎসবে যুবক-যুবতীরা অংশ গ্রহণ করে। এ খোলায় যুবক হলে যুবতীর দিকে এবং যুবতী হলে যুবকের দিকে পানি ছিটিযে দেয়। পানি উৎসবের মাধ্যমে তারা একে অপরকে শুভেচ্ছার বৃষ্টিতে সিক্ত করে এবং পুরেনো বছরের সকল দুঃখ ও গ্লানি ধুয়ে মুছে পুত-পবিত্র হয়ে নতুন জীবনের দিকে পা বাড়ায়।

 

 

 

 

 

রিলং পোয়েহ্ বা Water Festival

 

গরইয়া নৃত্য

ইয়া নৃত্য

 

ত্রিপুরা সমাজের মূলত পুরুষরা ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্যকরে থাকে। পৌরাণিক কাহিনীর সূত্রে ধারণা করা হয়, শিব তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী সতী বা গৌরীর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে যে নৃত্য করেছিল তার মাধ্যমে প্রলয়ংকরী বৃষ্টি সৃষ্টি হয়েছিল। গৌরীর শোকে এই প্রলয়ংকরী নৃত্য করা হয়েছিল বলে এই নাচের নাম গৌরী বা স্থানীয়ভাবে গরইয়া নৃত্য। এ সময় পাহাড়ি কৃষি পদ্ধতি জুমে ফসল বোনার সময়। বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে জুমে ফসল বোনা হয়। স্ত্রীশোকে শোকাহত শিব কখন তার উদ্দাম নৃত্য করেছিল জানা না গেলেও পার্বত্যবাসী ত্রিপুরাদের জুমে ফসল বোনা শুরু হয় চৈত্র এবং বৈশাখ মাসে। এই সময় বৃষ্টির অভাবে প্রকৃতি থাকে শুকনা খটখটে। তাই ধারণা করা হয় চৈত্র মাসের শেষে এবং বৈশাখ মাসের সপ্তাহব্যাপী এই নৃত্যের মূল উদ্দেশ্য বৃষ্টি আবাহন, শস্যক্ষেতের সমৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগব্যাধি থেকে মুক্তি।

থানমানা

 

থান অর্থ স্থান বা ভূমি আর মানা অর্থ আরাধনা বা পূজা করা। চাকমা সমাজে সমষ্টিগত পূজার মধ্যে থানমানাউল্লেখযোগ্য। গ্রামের মঙ্গলের জন্য বাস্ত্ত দেবতা থানকে এ পূজা দেয়া হয়। গ্রামবাসীরা পূজার আয়োজনের জন্য প্রত্যেক বাড়ি থেকে মোরগ বা মুরগী, চাল ও অর্থ সংগ্রহ করে। এরপর নদীতে তিনটি বাঁশ পুঁতে তার উপর গঙ্গাদেবীর জন্য ঘর তৈরি করা হয়। তার সম্মুখে মাটির বেদী প্রস্ত্তত করে বিয়েত্রার আসন চিহ্নিত করা হয়। ভুতের রাজার পুতা হয় গাছের ডাল। কাদার উপর বাশ পুতে এবং বেত দিয়ে নকশা করে ধান ও তুলা ইত্যাদি ফসলের প্রতিকৃতি সাজানো হয়। এ পূজায় শুকর ও মোরগ-মুরগী বলি দেয়া হয়। কথিত আছে, ১৪ দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে এ পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে।