মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

রাজবন বিহার

             চিন্তাপ্রচারক ও ধর্ম-দার্শনিক বৌদ্ধধর্মীয় নেতা শ্রদ্ধেয় সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তে।তাঁর জন্ম ১৯২০ সালের ০৮ জানুয়ারি। বুদ্ধের বাণী এবং তার দর্শনের স্থায়িত্ব,বিলুপ্তি ও বিকৃতি থেকে সুরক্ষা এবং প্রচার ও প্রসার নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে বনভান্তে নিমগ্ন সাধক; একাধারে তিনি জ্ঞানসাধক, অরণ্যচারি,সমাজ-সংস্কারক ও সত্যসন্ধানি। হিংসা-শত্রুভাবাপন্নতা-লোভকে পরিত্যাগ করে, এমনকি,সর্বোপরি প্রায় সকলের আরাধ্য, জাগতিক সংসারসমুদ্র (পারিবারিক সহজ কাঠামো অর্থে) ত্যাগ করে তিনি আধ্যাত্মচিন্তায় নিবিষ্ট হয়েছেন। প্রায় ৬০ বছরের অধ্যয়ন _ বিশেষত বিভিন্ন ধর্মের গ্রন্থ ও বাণী পাঠ, সাধনা আর পদ্ধতি আচারের মধ্য দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন অনুকরণীয় পথরেখা। জাতি ও ধর্মগত ভেদাভেদের অতিউধের্্ব স্বীয় অবস্থানস্থল নিশ্চিত করে, সকল সংকীর্ণতার সামাজিক বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করে, আপন ভুবন নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছেন এই মহান ঋষি। ব্যক্তিগত সংযম প্রতিষ্ঠা আর পারিবারিক বিবাদসমূহকে দূর করে শান্তির সুবাতাস নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন মহান বারতা।

                    তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, সত্যকে জানা, নীতিতে আস্থা প্রতিষ্ঠা করা,সাধারণের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনন্যসাধারণ হয়ে ওঠার মধ্যে স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করা যায়; আর এই স্বাধীনতার অনুভবই ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে পৌঁছে দিতে পারে পরম প্রত্যাশিত নির্বাণের উদার ও অপরিসীম প্রান্তরে। আর জ্ঞানী ও সত্য-সন্ধানীর সাথে ধর্ম নিয়ে প্রতারণা করতে পারে না ধান্দাবাজ মানুষ কিংবা কোনো অশুভ শক্তি। মদ-জুয়ায় আসক্তি কিংবা আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর প্রবণতা থেকে মানবজাতিকে নিরাপদ-দূরত্বে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বনভন্তেরউপদেশ এবং ভাষণ যে মানুষ শোনে এবং চিন্তাপ্রচারক ও ধর্ম-দার্শনিক শ্রদ্ধেয় সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের বাণী শুনবার জন্য যে হাজার হাজার মানুষ একটি বিশেষ দিনে রাঙামাটির রাজবাড়ির কোল ঘেঁষা বিহারের স্থির চত্তরে সমবেত হয়।

 


           বনভন্তের কথা শুনবার জন্য, তাঁকে একনজর দেখবার জন্য, তাঁর অনুসরণীয় পধ ধরে জীবনের বাকি সময়টা পার করবার প্রত্যয় ধারণের জন্য পার্বত্য তিনজেলাসহ সারাদেশের (বহির্দেশেরও বটে) অগণন মানুষের উপচে পড়া ভিড় মনে করিয়ে দেয় যে, ধর্মের পথ থেকে লোকেরা সত্যি সত্যি বিচ্যুত হয়নি। তিনি ৩০ জানুয়ারি ২০১২ বিকেলে ৯২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন।

 

               আশ্রমের পরিসর, পরিবেশ ও পরিবেশনায় যে কেউমুগ্ধহবেন । হাজার হাজার লোক (সবাই যে আবার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এমন নয়) জড়ো হয়েছে আশ্রমে। কী অপরূপ মিলনমেলা! নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ_ সকলে হাত ধরে, মৃদু পায়ে যেন আনন্দময় পরিবেশ নির্মাণ করে চলেছে তারা। এখানকার সাধনার পরিসর ও পরিবেশ এবং প্রকাশনা ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা সত্যিই অবাক করার মতো। আশ্রমের অধিবাসীদের পারস্পরিক সম্পর্ক, শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা, দাপ্তরিক পদ-পদবী ও রীতিনীত, ধর্মীয় আচরণ_ সবকিছু মিলে এককথায় মুগ্ধ হবার মতো জায়গা এবং ঘটনার সমাবেশ এই বনভন্তের আশ্রম। কী সুন্দর মিলনের আহ্বান! কী দারুণ সহযোগ।

 

স্বর্গের ৭ স্তর।

                   বনভন্তের এই আশ্রমে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং বিনিয়োগে প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ ও স্মরণিকা। কিছু দুষপ্রাপ্য গ্রন্থ অনুবাদের মাধ্যমে পালি ভাষা থেকে বাংলায় রূপান্তরেরও কাজ চলছে। আশ্রম ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নিজস্ব ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ছাপাখানা। পার্বত্য অঞ্চলের সুনিবিড় পর্যটন পাটাতনে এই ধর্মজ্ঞানচর্চাকেন্দ্রটি বাংলাদেশসহ সারাপৃথিবীর জ্ঞানক্ষেত্রে যোগ করেছেনতুন ব্যঞ্জনা। আর এখান থেকে দুনিয়ার সব প্রকৃতিপ্রেমী,সৌন্দর্যঘনিষ্ট ও জ্ঞানসাধকরা খুঁজে পাবে ভিন্নতর প্রণোদনা। ভ্রমণে দেখার আনন্দের সাথে খুব সহজেই যুক্ত হবে জানার নতুন ভুবন। সাংস্কৃতিক ভাববিনিময়ের সাথে মিলবে ধর্মচিন্তা, সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও সৌহার্দ্যবোধের অপার সুযোগ ও সাধনার আলোকময় পধের সন্ধান।